HSC সাহিত্যে খেলা প্রবন্ধের MCQ বহুনির্বাচনি প্রশ্ন উত্তর | PDF Download প্রমথ চৌধুরী
সাহিত্যে খেলা
প্রিয় শিক্ষার্থীরা,
আজ তোমাদের
জন্য নিয়ে এসেছি এইচএসসি বাংলা ১ম পত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যে খেলা প্রবন্ধের
নোট। এই নোটে তোমরা সকল কিছু পাবে।
উৎস ও পরিচিতি:
এই প্রবন্ধের
রচয়িতা প্রমথ চৌধুরী, যিনি বাংলা সাহিত্যে প্রবন্ধ সাহিত্যের নবযুগের সূচনা করেছিলেন।
তাঁর এই প্রবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৩২২ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ সংখ্যার ‘সবুজপত্র’
(১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দ)-এ। পরে তা সংকলিত হয় তাঁর ‘প্রবন্ধসংগ্রহ’ (১৯৫২) গ্রন্থে।
![]() |
| সাহিত্যে খেলা MCQ PDF Download |
মূলবক্তব্য:
‘সাহিত্যে খেলা’ প্রবন্ধে সাহিত্যের প্রকৃত স্বরূপ, তার উদ্দেশ্য এবং সাহিত্যিকদের যথার্থ করণীয় সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। প্রাবন্ধিক বিষয়টিকে সহজভাবে তুলে ধরার জন্য সাহিত্যকে খেলার সাথে তুলনা করেছেন। সাহিত্যও যে নিছক উদ্দেশ্যহীন আনন্দলাভের মতোই একধরনের খেলা, নানা যুক্তি ও উদাহরণের মাধ্যমে সে বিষয়ই তিনি এখানে তুলে ধরেছেন। এ প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি জগদবিখ্যাত ফরাসি ভাস্কর রোদ্যাঁর উদাহরণ টেনেছেন। রোদ্যাঁর মতো একজন বিখ্যাত ভাস্করও যে খেলাচ্ছলে আঙুলের টিপে মাটির পুতুল তৈরি করতেন সে বিষয় তিনি এখানে উল্লেখ করেছেন। ছোটো ছোটো কাজ করতে করতেই যে বড়ো সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে পৌছানো যায়; তা-ই তিনি ইঙ্গিত করেছেন। তিনি মনে করেন, কেউ যদি শুরুতেই খ্যাতিমান হয়ে উঠার উদ্দেশ্য নিয়ে সাহিত্যচর্চা শুরু করেন তবে সেটা তার পতনের কারণ হতে পারে। সবাই যে খেলাচ্ছলে সাহিত্যচর্চা শুরু করেন না বা করতে চান না তা নয়। এ কারণেই তিনি বলেছেন, একটু উঁচুতে না চড়লে আমরা দর্শক এবং শ্রোতৃমণ্ডলীর নয়ন মন আকর্ষণ করতে পারি না। তাঁর মতে, একটি বিশেষ অবস্থানে না গেলে কেউ আমাদের গুরুত্ব দেয় না। মানুষের একটি স্বভাবজাত প্রবণতা হলো অন্যের কাছে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণভাবে তুলে ধরা। আর এভাবে নিজেকে তুলে ধরে অন্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্যই অনেকে সাহিত্যচর্চা শুরু করেন। কিন্তু এক্ষেত্রে যখন তারা কাঙ্ক্ষিত সাফল্য বা খ্যাতি পান না, তখন তাদের সাহিত্যচর্চা বন্ধ হয়ে যায়। তাই প্রাবন্ধিক সাহিত্যের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেছেন, সাহিত্য রচনা করতে হবে মনের আনন্দে, কারো মনোরঞ্জনের জন্য নয়। কারণ কারো মনোরঞ্জনের জন্য সাহিত্য রচিত হলে সাহিত্যিক নিজে সেখানে খেলা না করে অন্যের জন্য খেলনা তৈরি করে বসেন, যা দীর্ঘসময় কারো মনোরঞ্জন করতে পারে না। শিশুদের খেলনার মতোই দুদিন পর তা পরিত্যক্ত হয়ে যায়। তাই তিনি এখানে সাহিত্যিকদের নিজের মনের আনন্দে কালজয়ী সাহিত্য সৃষ্টির জন্য অনুপ্রাণিত করেছেন। -এছাড়া সাহিত্য আর শিক্ষা যে এক নয়, সেটাও তিনি এখানে উল্লেখ করেছেন। তিনি মনে করেন, মনের আনন্দে কবি যে কাব্য রচনা করেন, শিক্ষক তার ব্যবচ্ছেদ করে তার রসাস্বাদনের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের বাধাগ্রস্ত করেন। এক্ষেত্রে শিক্ষকদের অবস্থান যে কবির বিপরীতে সেটাও তিনি উল্লেখ করেছেন। এ কারণেই কবিতার প্রতি মানুষের মধ্যে ইদানীং যে অনাগ্রহ দেখা যায়, তার জন্য তিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আর শিক্ষকদেরই দায়ী করেছেন। আবার, সাহিত্য সৃষ্টিকে তিনি স্রষ্টার পৃথিবী সৃষ্টির অনুরূপ বলেও আখ্যায়িত করেন। কেননা, স্রষ্টা তাঁর কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য বা অভাব থেকে এই পৃথিবী সৃষ্টি করেননি, তিনি এই পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন কেবল খেলার জন্য আর সেই খেলা থেকে আনন্দলাভের জন্য। কবি বা সাহিত্যিকরাও অনুরূপভাবে নিজেদের কোনো প্রয়োজন বা অভাব দূর করার জন্য সাহিত্য সৃষ্টি করেন না। তাঁরাও তাঁদের মনের আনন্দে এসব করে থাকেন।
নামকরণ:
‘সাহিত্যে খেলা’ প্রবন্ধটির নামকরণ করা হয়েছে এর অন্তর্নিহিত বক্তব্যের উপর ভিত্তি করে। একজন সাহিত্যিক কীভাবে তাঁর সাহিত্যচা করবেন প্রাবন্ধিক এই প্রবন্ধে তার একটি দিকনির্দেশনা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। প্রাবন্ধিকের মতে, সাহিত্যচর্চা করতে হবে খেলাচ্ছলে। বিশেষ কোনো ফললাভের উদ্দেশ্য নিয়ে সাহিত্যচর্চা করলে তাতে ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি থাকে। তাই এই সাহিত্য সৃষ্টির সময় একজন সাহিত্যিকের মধ্যে নিষ্ফল খেলার মনোভাব থাকতে হবে। একইসাথে সাহিত্যের নামে অন্যের মনোরঞ্জনের জন্য খেলনা বানানো যাবে না। তাই বলা যায়, খেলাচ্ছলে সাহিত্যচর্চার নির্দেশনা প্রবন্ধে দেওয়ায় বিষয় অনুসারে নামকরণকে সার্থক বলা যায়।
রূপশ্রেণি:
‘সাহিত্যে খেলা’ বাংলা সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সার্থক প্রবন্ধ।
ভাষারীতি:
‘সাহিত্যে খেলা’ প্রবন্ধে প্রমিত ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে।
শব্দার্থ ও টীকা : সাহিত্যে খেলা প্রবন্ধের নোট
◑ রোদ্যাঁ -ফ্যাঁসোয়া অগুস্ত রোদ্যাঁ (১৮৪০-১৯১৭) বিশ্ববিখ্যাত ফরাসি ভাস্কর। তাঁর শ্রেষ্ঠ কীর্তির মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- ‘নরকের দুয়ার’ ও ‘বাঘার্স অব ক্যালে’। অন্যান্য অবিনশ্বর কীর্তি- ‘চিন্তাবিদ’, ‘আদম’, ‘ইভ’। তিনি ভিক্টর হুগো, বালজাক, বার্নার্ড শ প্রমুখ বিখ্যাত সাহিত্যিকের প্রতিকৃতি নির্মাণ করেন।
◑ শিব -মহাদেব, মঙ্গলকারী দেবতা।
◑ ইতর -নীচ, অধম। এখানে নগণ্য অর্থে ব্যবহৃত।
◑ কলারাজ্য -শিল্পকলার পরিমণ্ডল।
◑ অবতীর্ণ -অবতার হিসেবে মানুষের মূর্তিতে নেমেছে এমন বা নেমে আসা।
◑ মর্তবাসী – মাটির পৃথিবীর অধিবাসী।
◑ রসাতল – পুরাণে বর্ণিত ষষ্ঠ পাতাল, অধঃপাত, ধ্বংস।
◑ গতায়াত -যাতায়াত।
◑ প্রবৃত্তি -অভিরুচি, ইচ্ছা, ঝোঁক, আসক্তি।
◑ অগত্যা -অন্য উপায় না থাকায়, নিরুপায় বা বাধ্য হয়ে, অনিচ্ছা সত্ত্বেও।
◑ সুর তারায় চড়িয়ে রাখতে হবে – সুর উচ্চ সপ্তকে ধরে রাখতে হবে।
◑ গীতিকবিতা – আত্মভাবপ্রধান কবিতা বিশেষ (Lyric)।
◑ রঙ্গভূমি – আমোদ-প্রমোদের জায়গা। অভিনয় প্রদর্শনের স্থান।
◑ স্বগতোক্তি – আপন মনে নিজে নিজে কথা বলা, অন্যের উদ্দেশ্যে বলা হয়নি এমন উক্তি।
◑ স্বার্থ – নিজের উদ্দেশ্য সিদ্ধি।
◑ পরার্থ – অন্যের হিত, পরোপকার।
◑ নিষ্কাম কর্ম – ফললাভের কামনা করা হয়নি এমন কাজ।
◑ মোক্ষলাভ – ভববন্ধন থেকে মুক্তি লাভ, আত্মার মুক্তি অর্জন।
◑ জীবাত্মা – প্রাণীর দেহে অবস্থানকারী আত্মা।
◑ পরমাত্মা – পরম ব্রহ্ম, ঈশ্বর, সৃষ্টিকর্তা।
◑ মনোরঞ্জন – মনের সন্তোষ সাধন।
◑ স্বধর্মচ্যুত – নিজস্ব বৈশিষ্ট্য থেকে বিচ্যুত।
◑ খেলো করা – গুরুত্বহীন বা অসার করা।
◑ বৈশ্য প্রাচীন আর্যসমাজের চতুর্বর্ণের তৃতীয় স্তর-যারা কৃষিকাজ বা ব্যবসা-বাণিজ্য করত।
কঠিন অংশের ব্যাখ্যা:
১. ‘এই পুতুল গড়া হচ্ছে তাঁর খেলা।’—শিল্পীর খেলার মাধ্যমেই শিল্পরাজ্যের সব মহান সৃষ্টির জন্ম। শিল্প সৃষ্টির উপাদান নিয়েই বড়ো শিল্পীরা সবসময় একধরনের খেলায় মেতে থাকেন। আর এই খেলার ফলেই তাঁদের সৃষ্টিকর্ম সার্থক শিল্প হয়ে ওঠে। ‘সাহিত্যে খেলা’ প্রবন্ধের রচয়িতা প্রমথ চৌধুরী এ প্রসঙ্গেই তাঁর রচনায় ফরাসি ভাস্কর রোদ্যাঁর শিল্পসৃষ্টির উদাহরণ টেনেছেন। কাদামাটি নিয়ে পুতুল বানানোর মতো খেলার মাধ্যমেই সৃষ্টি হয়েছে তাঁর জগদবিখ্যাত সব শিল্পকর্ম। লেখকের মতে, এই খেলাই হলো পৃথিবীর সব সৃজনশীল শিল্পকর্মের মূল উৎস।
২. ‘পৃথিবীর শিল্পী মাত্রেই এই শিল্পের খেলা খেলে থাকেন।’—পৃথিবীর সকল শিল্পীরই শিল্প সৃষ্টির প্রয়াসকে ‘সাহিত্যে খেলা’ প্রবন্ধের লেখক খেলা হিসেবে বিবেচনা করেছেন। লেখক মত প্রকাশ করেছেন যে, শিল্পী যা কিছু সৃষ্টি করেন সেটি শিল্পীর কাছে একরকম খেলারই নামান্তর। এ প্রসঙ্গে বিশ্ববিখ্যাত ফরাসি ভাস্কর রোদ্যার সৃষ্টিকর্মকে উদাহরণ হিসেবে দেখিয়েছেন তিনি। মাটি নিয়ে পুতুল গড়ার খেলা খেলেই পৃথিবীজোড়া খ্যাতি পেয়েছেন রোদ্যাঁ। ঠিক তেমনি পৃথিবীর সকল শিল্পীই খেলার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত অভিনব সব সৃষ্টিশীল শিল্পকর্ম সৃষ্টি করে যাচ্ছেন।
৩. ‘যিনি গড়তে জানেন, তিনি শিবও গড়তে পারেন, বাঁদরও গড়তে পারেন।’—শিল্পরাজ্যে প্রকৃত শিল্পীদের রয়েছে অবাধ অধিকার। তাঁরা খুব সহজেই খেলাচ্ছলে যেকোনো শিল্পের রূপ প্রদান করতে পারেন। পৃথিবীর সকল শিল্পীই এরকম খেলার মাধ্যমে নিজ নিজ শিল্পের সাধনা করে থাকেন। এই খেলা করার সক্ষমতা থাকার কারণেই তাঁরা তাঁদের সৃজনশীলতার বহুমাত্রিক বিকাশ ঘটাতে পারেন। তাঁরা শিল্পের ভালো দিকটিও যেমন প্রকাশ করতে পারেন তেমনি নেতিবাচক দিকটিও প্রকাশ করতে পারেন। আর এভাবে, এভাবে তাঁরা যা-ই সৃষ্টি করেন না কেন, তা-ই শিল্পময় হয়ে ওঠে।
৪. ‘মন উঁচুতেও উঠতে চায়, নীচুতেও নামতে চায়।’—বস্তুত মানুষের মন বড়ো বিচিত্র বলে সেটি তার নিজস্ব খেয়ালে প্রায়ই অবস্থান পরিবর্তন করতে চায়। অনেক চিন্তাবিদ মনকে একটি অন্ধকার ঘরের সঙ্গে তুলনা করেছেন। অন্ধকার ঘর যেমন রহস্যজনক, তার কোথায় কী আছে তা বলা মুশকিল, তেমনই মানুষের মনও বড়োই রহস্যজনক। সাধারণ মানুষের মন অনেকটা গতিহীন। তারা প্রগতির পথে অগ্রসর হতে পারে না, আবার একেবারে পশ্চাৎ অবস্থানেও থাকতে চায় না। শিল্পীমনও সবসময় উঁচুদরের শিল্পকর্মে সন্তুষ্ট থাকে না; কখনো কখনো খেয়ালের বশে অতি সাধারণ শিল্পকর্মেও ব্রতী হয়। মহৎ শিল্পীরা এই উঁচু-নিচুতে গমনাগমন করতে পারেন সাবলীলভাবেই।
৫. ‘এ পৃথিবীতে একমাত্র ব্রাহ্মণশূদ্রের নেই।’—খেলার ময়দানে উদ্দেশ্যহীন আনন্দদানই একমাত্র লক্ষ্য বলে সেখানে ধর্ম-বর্ণের কোনো প্রভেদ থাকে না। খেলার ময়দানে আনন্দের জন্য ব্রাহ্মণের ছেলের সঙ্গে শূদ্রের ছেলে এমন কি রাজার ছেলের সঙ্গে দরিদ্রের ছেলেরও খেলায় যোগ দেওয়ার অধিকার থাকে। সাহিত্যজগৎও তেমনই এক প্রভেদহীন খেলার ময়দান।যে কেউ এখানে সহজে প্রবেশ করতে পারে। সাহিত্যচর্চা করতে করতে একজন নবীন সাহিত্যিকও পারে বিখ্যাত সব প্রবীণ সাহিত্যিকদের সাথে মিশে যেতে। এদিক থেকে খেলার মাঠের সাথে সাহিত্যের মাঠের যথেষ্ট মিল রয়েছে। সাধারণত মানুষ যখনখেলা করে তখন সে আনন্দ ছাড়া অন্য কোন কিছুর আকাঙ্ক্ষা রাখে না। সকল প্রকার ক্রিয়ার মধ্যে ক্রীড়া শ্রেষ্ঠ, কেননা কোনোকিছুর আকাঙ্ক্ষা রাখে না। নিষ্কাম আনন্দই তার একমাত্র প্রত্যাশা। মানুষ খেলা করে শুধু সেসময়ের কাঙ্ক্ষিত আনন্দের জন্য, অন্য কোনোকিছু পাওয়ার ইচ্ছা তার থাকে না। ‘সাহিত্যে খেলা’ প্রবন্ধের লেখক মনে করেন, খেলার পিছনে ব্যক্তির কামনা বাসনা বা আভিসন্ধির মতো কোনো হীন প্রবৃত্তি কাজ করে না। খেলাকে তাই তিনি শ্রেষ্ঠ কর্ম হিসেবে বিবেচনা করেন।
৭. ‘যে খেলার ভিতর আনন্দ নেই কিন্তু উপরি পাওনার আশা আছে, তার নাম খেলা নয়, জুয়াখেলা।’—আনন্দবিহীন উপরি পাওনার লোভে যে খেলা হয় তাকে জুয়াখেলার সাথে তুলনা করা যায়। সাহিত্য হবে নিছক আনন্দের জন্য আর আনন্দের উদ্দেশ্যে রচিত সাহিত্যই হলো প্রকৃত সাহিত্য। প্রমথ চৌধুরীর মতে, সাহিত্য কেবল সাহিত্যিকের হৃদয় নিঃসৃত আনন্দের ঝরনাধারা দিয়েই প্রবাহিত হবে। কেননা, অর্থ-যশ লাভের জন্য সাহিত্য রচনা করলে বা অন্যের মনোরঞ্জনের জন্য সাহিত্য রচনা করলে তা হবে অত্যন্ত নিম্নমানের সাহিত্য, যা জুয়াখেলার মতোই। কেননা, এতে উপরি পাওনার আশা থাকে। আর প্রকৃত সাহিত্যে থাকে উদ্দেশ্যবিহীন স্বতঃপ্রণোদিত খেলার মতোই নির্মল আনন্দ।
৮. ‘তিনি গীতের মর্মও বোঝেন না, গীতার ধর্মও বোঝেন না।’—যারা পাঠকের মনোরঞ্জনের উদ্দেশ্যে সাহিত্য রচনা করেন তাদের সমালোচনা করে প্রাবন্ধিক মত দিয়েছেন যে, তারা সাহিত্যের মর্ম বুঝতে অক্ষম। সাহিত্য রচিত হয় লেখকের মনের আনন্দের জন্য এবং অন্যকে আনন্দ দেওয়ার জন্য। এর বাইরে অন্য কোনো ফললাভের আশা লেখকদের করা উচিত নয় বলে প্রমথ চৌধুরী মনে করেন। মূলত যারা আনন্দ ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে সাহিত্য রচনা করেন তারা সাহিত্যের মর্ম সম্পর্কে অজ্ঞ।
৯. ‘কবির সৃষ্টিও এই বিশ্ব সৃষ্টির অনুরূপ।’—বিশ্ব সৃষ্টিতে ঈশ্বরের যেমন নির্দিষ্ট কোনো কার্যোদ্ধারের অভিপ্রায় নেই, সাহিত্য সৃষ্টিও তেমনি অভিপ্রায়হীন। বিশ্ববিধাতার কোনোকিছুরই অভাব নেই। তারপরও তিনি এই বিশ্ব সৃষ্টি করেছেন শুধু নিজের আনন্দের জন্য। কবির রচনার ক্ষেত্রেও একইরকম উদ্দেশ্যহীন স্ফূর্তি ও উদ্দীপনা থাকে। অর্থাৎ কবির কাজ কারো মনোরঞ্জন বা অভাব দূর করা নয় বরং নিজে আনন্দ পাওয়া ও মানুষকে আনন্দ দেওয়া।
১০. ‘সাহিত্য সৃষ্টি জীবাত্মার লীলামাত্র।’—সাহিত্য সৃষ্টি জীবাত্মার লীলামাত্র; কোনো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিষয় নয়। খেলার মতোই এ কাজের পিছনে সাহিত্য স্রষ্টার নির্মল আনন্দলাভ ছাড়া অন্য কোনো কামনা-বাসনা থাকে না। সাহিত্যের লীলা বিশ্বলীলারই অন্তর্ভুক্ত। কারণ জীবাত্মা পরমাত্মারই অঙ্গ ও অংশবিশেষ। সাহিত্যের খেলা উপভোগের মতো জীবজগতে অন্য কোনো নিষ্কাম কর্ম নেই। এ প্রসঙ্গে লেখক বিধাতার সৃষ্টির প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন। স্বয়ং ভগবান গীতায় বলেছেন, তাঁর কোনো অভাব নেই, তবু তিনি এ বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করেছেন। প্রাবন্ধিকের মতে, কবির সৃষ্টিও বিশ্ব সৃষ্টির অনুরূপ। সে সৃষ্টির মূলেও কোনো অভিপ্রায়, উদ্দেশ্য বা কামনা-বাসনা নেই। আছে কেবল নির্মল আনন্দ।
১১. ‘সাহিত্যের উদ্দেশ্য সকলকে আনন্দ দেওয়া, কারও মনোরঞ্জন করা নয়।’—কারো মনোরঞ্জন করতে গেলে সাহিত্য তার স্বধর্মচ্যুত হয়ে পড়ে। বস্তুত খেলায় মানুষ যেরূপ আনন্দ পেয়ে থাকে, সাহিত্যেরও প্রধান উদ্দেশ্য মানুষকে সেই ধরনের আনন্দ দেওয়া। মনোরঞ্জন করার মধ্যে একধরনের কৃত্রিম প্রয়াস বা বিশেষ উদ্দেশ্য থাকে। কিন্তু আনন্দ দেওয়ার ব্যাপারটিতে কোনো উদ্দেশ্য বা স্বার্থচিন্তা থাকে না, তা স্বতঃস্ফূর্ত। স্বতঃস্ফূর্ত খেলার ভিতর যে আনন্দের সন্ধান পাওয়া যায়, তা-ই পাওয়া যায় নির্মল সাহিত্যের মধ্যেও।
১২. ‘সমাজের মনোরঞ্জন করতে গেলে সাহিত্য যে স্বধর্মচ্যুত হয়ে পড়ে।’—সাহিত্যের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষকে নির্মল আনন্দ দেওয়া। কিন্তু এই আনন্দের পরিবর্তে যদি পাঠকের বিশেষ চাহিদা পূরণের জন্য সাহিত্যকে মনোরঞ্জনের উপকরণ বানিয়ে ফেলা হয়, তবে তা স্বধর্মচ্যুত হয়ে পড়ে। স্বধর্মচ্যুত সাহিত্যের আবেদন হয় ক্ষণস্থায়ী। শিশুদের খেলনার মতোই কদিন পরে তা পরিত্যক্ত হয়ে যায়। পক্ষান্তরে, যে সাহিত্য একজন সাহিত্যিক তাঁর নিজের মনের আনন্দে সৃষ্টি করে থাকেন সেই সাহিত্য কখনো কালের গর্ভে বিলীন হয় না। যুগ যুগ ধরে এটি পাঠকের মনে আনন্দ বিলিয়ে যায়। যার ফলে তা হয়ে উঠে কালজয়ী। তাই শিশুদের খেলনার মতো করে সাময়িক মনোরঞ্জনের জন্য কোনো সাহিত্য, রচনা করা উচিত নয়।
১৩. ‘কাব্যজগতে যার নাম আনন্দ, তারই নাম বেদনা।’—সাহিত্য হলো মানবজীবনের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনা ও নানামুখী আবেগ-অনুভূতির এক শৈল্পিক প্রকাশ, যা থেকে আনন্দ নামক এক অভিন্ন রসের খোরাক মেটে। সাহিত্যে অনেক সময় মানবজীবনের র্ট্যাজিক বেদনার রূপ প্রতিফলিত হয়। তা আস্বাদনে সবাই একধরনের আনন্দ লাভ করে। যদিও তার মূলে রয়েছে বেদনাময় আখ্যান। পাঠক সমাজকে আনন্দ দিতে গেলে কবিরা অনেক সময় বেদনা বোধ করে থাকেন। তাই কাব্যজগতে যা আনন্দ রসের আধার, তারই অন্য নাম বেদনা।
১৪. ‘কবির মতিগতি শিক্ষকের মতিগতির সম্পূর্ণ বিপরীত।’—প্রমথ চৌধুরী সাহিত্য ও শিক্ষার উদ্দেশ্যের ভিন্নতার কথা প্রবন্ধে প্রকাশ করেছেন। শিক্ষা বিষয়টি মানুষ সাধারণত নিতান্ত অনিচ্ছার সাথেই গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। আর এই বাধ্য করার কাজটির দায়িত্বে থাকেন শিক্ষক। অন্যদিকে, কবির উদ্দেশ্য সাহিত্যের মাধ্যমে মানুষের মনের জাগরণ ঘটানো। এটি বল প্রয়োগে নয় বরং মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণেই সম্ভব। এ কারণেই শিক্ষক ও কবির মতিগতিকে সম্পূর্ণ বিপন্নোত পঞ্চতির বলে অভিহিত করা হয়েছে।
১৫. ‘সাহিত্যের উদ্দেশ্য মানুষের মনকে জাগানো।’—সাহিত্যের উদ্দেশ্য মানুষকে শিক্ষা দেওয়া নয়। সাহিত্যের রস অমৃত সুধার মতো সঞ্জীবনী শক্তিসম্পন্ন। এর স্পর্শে মানুষের অন্তরাত্মা সজীব ও বিকশিত হয়। মানুষের মাঝে সত্যিকার অর্থে মানবিকতার জাগরণ ঘটায় সাহিত্য। শিক্ষাদানের মতো জোরপূর্বক প্রক্রিয়ায় নয় বরং আনন্দদানের মাধ্যমে মনকে জাগানোই সাহিত্যের উদ্দেশ্য।
১৬. আনন্দের ধর্মই এই যে তা সংক্রামক।—সাহিত্যের উদ্দেশ্য মানুষকে আনন্দ দেওয়া আর তা সহজেই সবার হৃদয়ে সঞ্চারিত হয়। বাল্মীকি রচিত রামায়ণ মুনিঋষিদের জন্য রচিত হলেও এর সাহিত্যগুণের কারণে পাঠক সমাজে তা যুগ যুগ ধরে যথেষ্ট সমাদৃত হয়ে আসছে। অন্যদিকে, শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে রচিত যোগবশিষ্ঠ রামায়ণের সেই গুণ না থাকায় পাঠক সমাজে তা সমাদৃত হতে পারেনি। বাল্মীকি রচিত রামায়ণের আনন্দ প্রদানের ক্ষমতা ছিল বলেই প্রতিনিয়ত তার চর্চা বাড়ছে। এ থেকেই বোঝা যায় যে, আনন্দ সবসময় সংক্রামক। তাই একজনের মধ্য থেকে আরেকজনের মধ্যে তা ছড়িয়ে। পড়ে। ছড়িয়ে পড়ে কাল থেকে কালান্তরেও।
১৭. ‘সাহিত্য ছেলের হাতের খেলনাও নয়, গুরুর হাতের বেতও নয়।’—সাহিত্যের প্রতি তীব্র আকাঙ্ক্ষা আর রসবোধ না থাকলে তাকে কখনো সঠিকভাবে গ্রহণ করা যায় না। সাহিত্যের রস আস্বাদন করতে হলে সেটা নিজের বোধ দিয়েই গ্রহণ করতে হয়। অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি বা ব্যাখ্যা দিয়ে কখনো সাহিত্যের রস আস্বাদন করা সম্ভব নয়। এর জন্য পর্যাপ্ত সাহিত্যজ্ঞান এবং সমৃদ্ধ শব্দভান্ডার থাকাটাও জরুরি। তাই সাহিত্যরস পান করাটা সবার পক্ষেই খুব সহজ নয়। অপরদিকে, জোর করেও কাউকে এই রস আস্বাদন করানো সম্ভব নয়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মাধ্যমে সাহিত্যকে যেভাবে ব্যবচ্ছেদ করে তার গূঢ় অর্থ বোঝানোর চেষ্টা করা হয়, তাতে আর যাই হোক সাহিত্যের যে মূল উদ্দেশ্য আনন্দলাভ করা, তা অধরাই থেকে যায়। তাই প্রাবন্ধিক প্রমথ চৌধুরী যথার্থই বলেছেন, সাহিত্য ছেলের হাতের খেলনাও নয়, গুরুর হাতের বেতও নয়।
